শুভ মুহুর্ত, শুভ সংস্কার

প্রফেসর ডঃ কুশল সেন  

মুহুর্ত শাস্ত্রের নিয়ম, উপনিয়ম, পৌরাণিক সংস্কার ও মতান্তর এত বেশী যে সর্বশুদ্ধ মুহুর্ত গণনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ ও করণের শ্রেষ্ঠতা, ভিন্ন ভিন্ন কার্য সম্পাদনে ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্রের উল্লেখ, গন্তান্ত, নক্ষত্রান্ত, বার-তিথির সংযোগে উৎপন্ন নক্ষত্রদোষ; এর অতিরিক্ত চন্দ্রবল, গ্রহের গোচরবল, আয়ন, বর্ষ সম্বৎসর, মাস, পক্ষ, প্রহর ইত্যাদির শুদ্ধি কম কঠিন গণনা নয়। যদি এক বড় নিয়ম-উপনিয়ম পালন হয় তো দ্বিতীয়টির উলঙ্ঘন হয়ে যায়। এই আলেখ্যটিতে কোন নক্ষত্রগুলি কোন শুভকার্য সম্পাদনে শুভ তা সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হল। এই সঙ্গে বলা বাহুল্য, পঞ্চাঙ্গের অন্য অবয়বের সম্বন্ধিত শুদ্ধিকরণে, তিথির একগুন, নক্ষত্রের চারগুন, বারের আটগুণ, করণের ষোলগুণ ও যোগের বত্রিশগুণ ধার্য করা হয়।

পঞ্চাঙ্গ কি ও তার উপকারিতা – যেকোন কার্যসম্পাদনে শুভাশুভ মুহুর্ত গননার জন্য পাঁচটি অঙ্গের সমন্বয়ে তৈরি শাস্ত্রসম্মত বিধিনিষেধ যে গ্রন্থে লিপিবদ্ধ ও প্রকাশিত করা হয় তাকেই ‘পঞ্চাঙ্গ’ বলে। এই পাঁচটি অঙ্গ হল – (১) তিথি (২) বার (৩) নক্ষত্র (৪) যোগ (৫) করণ।

তিথি – পঞ্চাঙ্গের আধারে তিথি ১৯ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। একটি চান্দ্রমাসে ৩০টি তিথি থাকে যা দুটি পক্ষ – শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষতে বিভক্ত। প্রতিটি পক্ষে প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা এই ১৫টি তিথি থাকে। তিথি দর্শনে সম্পত্তিপ্রাপ্তি ও লক্ষ্মী বৃদ্ধি হয়।

বার – একটি সপ্তাহে ৭ দিন ও ৭ টি বার – রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি থাকে। বার স্মরণে বা শ্রবণে আয়ুর অভিবৃদ্ধি হয়।

নক্ষত্র – জ্যোতিষশাস্ত্র মতে তারামণ্ডলে মূলত ২৭টি নক্ষত্র আছে, এছাড়াও আরও একটি নক্ষত্র রয়েছে যার নাম ‘অভিজিৎ’ এবং তাকে জ্যোতিষীয় গননায় সচরাচর গন্য করা হয়না। কিন্তু যেকোন শুভকার্য সম্পাদনে অভিজিৎ নক্ষত্র সর্বোত্তম। চন্দ্রমা রাশিচক্রে এই ২৭টি নক্ষত্র ভ্রমণ করে এক চান্দ্রমাস সম্পূর্ণ করে। নক্ষত্র স্মরণে পাপ নিবারণ হয়।

যোগ – ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্রে মত ২৭ প্রকারের যোগ বর্তমান। রবি ও চন্দ্রের অবস্থানগত বিশেষ দূরত্বের স্থিতিকে যোগ বলা হয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট যোগস্মরণে রোগনিবৃত্তি হয় ও প্রিয়জন বিয়োগ নাশ হয়।

করণ – একটি তিথিতে দুটি করণ থাকে অর্থাৎ তিথির অর্ধেকই করণ। একটি পূর্বার্ধের করণ এবং অন্যটি উত্তরার্ধের করণ। বব, বালব, কৌলব, তৈতিল, গর, বর্নিজ, বিস্টি, শকুনি, চতুষ্পাদ, নাগ ও কিন্তঘ্ন সহ মোট ১১টি করণ আছে। করণ স্মরণে নিজের কার্য সফল হয়। পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র রোজ পঞ্চাঙ্গের শ্রবণ করতেন।

শুভকার্য সম্পাদনে নক্ষত্র – আধুনিক কালে জীবনযাত্রার প্রবাহে বিভিন্ন ধরণের শুভকার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নক্ষত্র বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা নেয়।

(১) মন্ত্রী ও অন্যান্য সরকারী গুরুত্বপূর্ণ পদে শপথগ্রহণ কালে, কোনও শহর বা ফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও শিলান্যাসকালে এবং অস্ত্রপচারের সময় রোহিণী, উত্তর-ফাল্গুনী, উত্তরাষাঢ়া ও উত্তরভাদ্রপদ অত্যন্ত শুভফলপ্রদ।

(২) যেকোন শিল্পারম্ভ বা উদ্যোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে অশ্বিনী, পুষ্যা, হস্তা ও অভিজিৎ নক্ষত্র বিশেষ শুভফলপ্রদ।

(৩) বাহন ক্রয়ের ক্ষেত্রে শ্রবণা, ধর্নিষ্ঠা, শতভিষা, পুনর্বসু খুবই শুভফলদায়ী।

(৪) বিবাহ ব্যতীত অন্য যেকোন কাজের জন্য পুষ্যা নক্ষত্র বিশেষ শুভ।

(৪) নবজাতকের নামকরণের ক্ষেত্রে জাতক-জাতিকার জন্মের ১০ম, ১২শ ও ১৬শ দিবসে যদি অনুরাধা, পুনর্বসু, মঘা, উত্তরফাল্গুনী, উত্তরাষাঢ়া, উত্তরভাদ্রপদ, শতভিষা, স্বাতী, ধর্নিষ্ঠা, শ্রবণা, রোহিণী, অশ্বিনী, মৃগশিরা, রেবতী, হস্তা, পুষ্যা নক্ষত্র যদি সোম, বুধ, বৃহস্পতি বা শুক্রবারে পতিত হয় তাহলে অত্যন্ত শুভ ফলদায়ী।

(৫) নবজাতকের অন্নপ্রাশনের ক্ষেত্রে, জাতক-জাতিকার জন্মের ৬ষ্ঠ, ৮ম ও ৯ম মাসে যদি অশ্বিনী, মৃগশিরা, পুনর্বসু, ধর্নিষ্ঠা, পুষ্যা, হস্তা, স্বাতী, অনুরাধা, শ্রবণা, শতভিষা, এবং চিত্রা নক্ষত্র যদি বুধ, বৃহস্পতি বা শুক্রবারে পতিত হয় তাহলে শুভ ফল প্রাপ্তি হয়।

(৬) প্রথম কেশকর্তন এর ক্ষেত্রে নবজাতকের ৩য় বা ৫ম বর্ষে যদি পুনর্বসু, মৃগশিরা, ধর্নিষ্ঠা, শ্রবণা, রেবতী, পুষ্যা, চিত্রা, অশ্বিনী, হস্তা নক্ষত্র সোম বুধ, বৃহস্পতি বা শুক্রবারে পতিত হয় (প্রতিপদ ও পূর্ণিমা তিথি ব্যতীত) তাহলে তা অত্যন্ত শুভ।

(৭) বিদ্যারম্ভের ক্ষেত্রে, নবজাতকের ৫ম বর্ষের ৫ম মাসের ৫ম দিনে (যেখানে জাতকের ৫ম বর্ষে যেদিন জন্মনক্ষত্র পতিত হবে প্রথমবার) যদি অশ্বিনী, পুনর্বসু, আর্দ্রা, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, শ্রবণা, রেবতী নক্ষত্র; সোম, বুধ, বৃহস্পতি বা শুক্রবারে পতিত হয় তাহলে শুভ ফলপ্রদ।

(৮) গৃহ স্থানান্তকরণের ক্ষেত্রে জাতক-জাতিকা বা পরিবারের সদস্যদের জন্মনক্ষত্র ব্যতীত অনুরাধা, মৃগশিরা এবং হস্তা নক্ষত্র শুভ কার্যকরী।

(৯) গৃহ সংস্কার নির্মাণ এর ক্ষেত্রে, সব চাইতে শুভ মুহুর্ত হল বৃহস্পতি যখন রোহিণী, মৃগশিরা, অশ্লেষা, উত্তর-ফাল্গুনী, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা ও উত্তরভাদ্রপদ নক্ষত্রে গোচরগত হবে তখন।

(১০) অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে শুভ মুহুর্ত গন্য করা হয় যখন, চন্দ্র শুক্লপক্ষের একাদশী তিথি থেকে কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী তিথি পর্যন্ত বলবান থাকে কিন্তু কখনই পূর্ণিমা তিথিতে নয়। এছাড়াও জন্মনক্ষত্র যদি আর্দ্রা, জ্যেষ্ঠা, অশ্লেষা বা মূলা হয় এবং তা যদি চতুর্থী, নবমী বা চতুর্দশী তিথি হয় তাহলে অস্ত্রোপচার থেকে নিবৃত্ত থাকাই বাঞ্ছনীয়। উপরন্তু শনি ও মঙ্গলের যদি সংযুক্তি, দৃষ্টি বিনিময় বা যেকোন একটি গ্রহ যদি বক্রী থাকে তাহলে অস্ত্রোপচার করা কোনমতেই বাঞ্ছনীয় নয়।

(১১) বিবাহের ক্ষেত্রে, জ্যেষ্ঠ পুত্র বা কন্যার বিবাহ জ্যৈষ্ঠ্য মাসে এবং জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে করা অশুভ পরিগণিত হয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Please follow and like us:
error0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *