“দন্ডকারন্য সৃষ্টি রহস্য” — ৬ পর্ব

সুজিত ভারতী 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর )

গুরু শুক্রাচার্যও তাদের মনের আনন্দে শিক্ষা দান করতে থাকলেন। ভোরের রবি তার আলোর আভাস যখন ধরনীর বুকে ছড়াবার উপক্রম করে, তখনই বেদ মন্ত্রে আশ্রম প্রাঙ্গন মুখরিত হয়ে ওঠে, শুরু হয় সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততা। দিনমনি যখন পশ্চিমাকাশে গোধূলির রঙে খেলাকরে, সাঙ্গ হয় আশ্রমের কাজ। শুরু হয় ধর্মালোচনা। সকল শিক্ষার্থীদের সাথেই চলছিল সমান তালে অরজা ও দেবযানী র অধ্যায়ন।

অপরদিকে পৃথিবীময় যখন শান্তির বাতাবরণ, ঋষি মুনিদের পূন্য শ্লোক,স্তবে মুখরিত ধরাধামে পাপের কলুষতা নাশ হচ্ছে, তখন স্বর্ন পালঙ্কে সোমরস মদিরায় আসক্ত মহারাজ দন্ড! রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের প্রজার পালন ভুলে মহামতি মনুর পৌত্র, আজ মগ্ন অরন্য মাঝে শিকার খেলা আর মদিরা পানে। গৃধ্র যতই আকাশের উঁচুতে উড়ে বেড়াকনা কেন,দৃস্টি তার সর্বদাই নিচেরদিকে গলিত পচিত মৃতের উপরই থাকে। মহারাজা দন্ডের অবস্থা ঠিক তেমনই! কর্মই হলো সবথেকে বড় ধর্ম

যে কর্ম করেনা তার ধর্মও নাই।

দন্ড তার কর্ম করেনা, ভুলেগেছে সে রাজ ধর্ম, কখন কাকে কি শাস্তি প্রদান করছেন সে নিজেই জানেনা। এখন যেন তার মূঢ়তা প্রতিপদে প্রকাশ পাচ্ছে। মূঢ় ব্যক্তি জানে আমার কোন ধর্মনিয়ে কাজ নেই, বকলমা দিয়ে রেখেছি গুরুর চরনে। আমার পাপ পূন্য ভালোমন্দ সে বুঝবে, আমি আমার বাহুবলে আর অর্থের দম্ভে সকল নাগপাশ কাটিয়ে চলব।তাই প্রতি মাসান্তে গুরু শুক্রাচার্যের আশ্রমে দন্ড যথারিতী সকল প্রয়োজনিয় দ্রব্য পাঠাতে থাকলো। গুরু শুক্রাচার্য প্রেরিত গ্রহনের পর মূঢ় রাজার কথা শুনতে চাইতেন রক্ষীর কাছে। রক্ষী সর্বদাই কুশল সংবাদ দিতেন। কিন্তু গুরুর চোখ ও জ্ঞানকে ফাঁকি দেয় এমন সাধ্য কার। শুক্রাচার্য ভালোকরেই জানতেন দন্ড একটি মূঢ় ও অকৃতবিদ্য মানুষ ফলে তিনি কিছুই বলতেন না, শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, -সবই অদৃষ্ট..

আগুন রঙা ফুলে ভরা এক শিমূল বৃক্ষের ছায়ায় শুক্রাচার্য মৃত্তিকা নির্মিত বেদীতে মৃগচর্মাসনে বসে নিভৃত্যে দন্ডর কথাই ভাবতে থাকেন। আর মনস্থির করেন কোন একসময় দন্ডর প্রাসাদে গিয়ে তাকে বলবেন আর বোঝাবেন, রাজ ধর্মের নানা বিষয়ে। যাতে সমস্ত হিংস্রতা, কামনা, বাসনা ছাড়াও তাঁর যে আরোকিছু দ্বায়িত্ব আছে, তাকে তা জ্ঞাত করাবেন।

এই শিমূল বৃক্ষ ছায়া শুক্রাচার্যের বড় প্রিয়। রক্তিম আভায় ভরে যাওয়া বৃক্ষ তলে, রক্ত বসন ধারন করে পিঙ্গল জটা দুই কাঁধের পাশথেকে নেমে যখন বেদীতল স্পর্শ করে, শান্ত গম্ভীর স্বরে যখন তিনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দানকরেন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যপট তৈরী হয়। তাঁর তেজ রাশির ছটায় আশ্রম প্রাঙ্গণ দীপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর আদেশ ছাড়া বৃক্ষের একটি পাতাও নড়েনা, কখনো দূর অরন্য থেকে কোন বিশালাকার শার্দুল আশ্রম সিমানায় ঢুকেপড়লেও ছোট্ট মৃগ শিশুটিকে দেখেও, মাথা নীচুকরে তার গা জিবদিয়ে চেটে আবার অরন্যে ফিরেযায়। উদ্যত ফনা বিষধর সর্পও রজ্জুর মতন পাশে পড়ে থাকে তাঁর চলার সময়, ভোরের সূর্য প্রথম কিরন ললাটে ছুঁয়ে তাঁকে আশিষ দেয়। নীশাকর স্নিগ্ধ পরশে তাঁর চরন ছোঁয়। তাঁর উচ্চারিত বেদমন্ত্রে উদ্বেল হয়ে ওঠে সমগ্র বনানী। তাঁর ক্রোধে যেন দুলতে থাকে বিন্ধ্য পর্বতের প্রতিটি শৃঙ্গ। উত্তাল হয়ে ওঠে শান্ত সরোবরের জলরাশি, সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ মহাঋষি, যাকে দেব কূল দানব কূল সকলেই ভয় ও সমীহ করে চলে। সে আজ চীন্তামগ্ন চিত্তে একাকী বসে শিমূল বৃক্ষ বেদী তলে। কিসের চিন্তা? কি ভাবনা এত ঋষি রাজের? শুধুইকি মূঢ় শিষ্যের চিন্তা তাকে ভাবাচ্ছে ? নাকি অন্য আরোকিছু ভাবনা, চিন্তা তাঁর দৃঢ় হৃদয়ে বাসা বেঁধেছে।

 

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, শান্ত সরোবরে স্নান করছেন শুক্রাচার্য, কটি সমান জলে দাঁড়িয়ে জল প্রদান করে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন নবীন অরুন কে। কিছু শিক্ষার্থী যজ্ঞের কাঠ সংগ্রহ করে তার আয়োজন করছে। কন্যদ্বয় অরজা এবং দেবযানী ব্যস্ত পিতার পূজার উপাচারের আয়োজন ও তদারকিতে। পিতা স্নান সেরে এক্ষুনি বসবেন পূজা ও যাগ যজ্ঞাদি কর্মে। না কোন বৃহত অনুষ্ঠান নয়! শুক্রাচার্য স্নান সেরে শুদ্ধ বসনে পূজায় বসেন। পূজা যজ্ঞাদি শেষে চলে শিক্ষা দন পর্ব ও ধর্মালোচনা।

তবে ঋষি রাজ আজ অবধি বেশ চিন্তিত চিত্ত বলেই মনে সকলের। জেষ্ঠা কন্যা অরজা পিতার এই চিন্তিত মুখটা বেশ কিছুদিন ধরেই খেয়াল করছিল। কিন্তু সাহস জুগিয়ে পিতার সন্মুখে উপস্থিত হয়ে তার কারন জানার চেষ্টা করনি। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারেনা অরজা তার অনুজা দেবযানীকে সব কথা সবিস্তারে বলল। এই আশ্রমে একমাত্র অরজা তাঁর সব কথা সহদরা দেবযানী কে বলে, আর দেবযানী বলে তাঁর দিদিকে। এছাড়া আর মনের কথা বলবেই বা কাকে।

তাই দুই বোন আলোচনা করে ঠিক করল পিতার কাছে এই চিন্তার কারণ জানতেই হবে। যার প্রতাপে স্বর্গ মর্ত্য কম্পমান তাঁর কিসের চিন্তা? শুক্রাচার্য স্নান সেরে শুদ্ধ বসনে যখন পূজাস্থলে আসছিলেন, দুই কন্যা অরজা ও দেবযানী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রনাম করলেন।

শুক্রাচার্য আশীর্বাদ প্রদান করে সহাস্য বদনে জানতে চাইলেন, “কি ব্যাপার তোমরা দুজনে একসঙ্গে হঠাৎ এই সময়, কিছু কি বলবে?

দুই বোন দুজনের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। এবং আমতা আমতা করে অরজা বলল…

(ধারাবাহিক )

Please follow and like us:
error0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *