ব্যক্তিগত নিবন্ধ – সুমন ঘোষ

দার্জিলিং থেকে ফিরেছি। আবার দেখলাম, থাকে থাকে চা বাগান। সাজানো মিরিক। হাতে গরম কফি নিয়ে কাঞ্চনজংঘায় সূর্যোদয়। ম‍্যালের শীতে একটু জিরিয়ে নিয়েই দার্জিলিং টি। আহা ভূবন ভোলানো রূপে সেজে দার্জিলিং। বারবার বহুবার গিয়ে দার্জিলিং যেন পাশের বাড়ি। উঠলো বাই তো দার্জিলিং যাই।
এবার বাড়ি ফিরে কেন না জানি আমার পাশের বাড়িতে চোখ পড়লো। কাজে অকাজে কতো যায়গায় যাই কিন্তু না জানি কতোদিন পাশের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। জগতের কতো খবর আমার কাছে জড়ো হয়ে আছে। পাকিস্তানের ইমরান থেকে আমেরিকার ট্রাম্প, বার্সার মেসি থেকে রোনাল্ডো কেন জুভেন্টাসে বা ইতালিতে সাতপাঁকে বাঁধাপরা রনবীর দীপিকার মেনুকার্ড পর্যন্ত। অথচ পাশের বাড়ির মিনু মাসি রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্ৰাস’ বা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ এখন আর ঝরঝরে মুখস্থ বলে কিনা সে খবর এখন আর আমার জানা নেই। জানা নেই ওদের উঠোন আর শিউলি ফুলে আগের মতোই ভরে থাকে কি না !
মনেআছে, পাশের বাড়ি মানে ঠিক আমাদের গায়ের উপর হুমড়ি খাওয়া বাড়িটাই নয়। বাড়ির উঠোনে গিয়ে একটু পা উঁচু করে দাঁড়ালে আশেপাশের যে কটা বাড়ি দেখা যায় সব ই তখন ‘পাশের বাড়ি’। নিজের বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে ছোট্ট দৌড়ে রন্টির বাড়ির বিছানায় বসেে দেদার গল্পে আমি যখন মশগুল, মা তখন নিশ্চিন্ত, ছেলে পাশের বাড়িতেই আছে। ওটাই আমার তখন নিজের বাড়ি।
পাশের বাড়ির বিল্টুর দিদির যখন বিয়ে হলো তখন আমার কি আনন্দ। বিল্টুর সংগে হাতে হাতে কত কাজ আমার। আর বিল্টুর দিদি পরের দিন যখন শ্বশুরবাড়ি যাবে, আশেপাশের সব বাড়ির দিদি কাকিমা জেঠী বিল্টুর বাড়ির সামনে মুখ ভারকরে দাঁড়িয়ে। পাশের বাড়ির মেয়ে এপাড়া থেকে চলে যাবে, মন চায়না। বিল্টুর বাবা,মা তো কেঁদেই সার। সবার চোখে জল। ঐ জলভরা আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বিল্টুর দিদি যখন নতুন জামাইবাবুর সাথে রওনা দিল, বিল্টু তখন আমার ঘাড়ে মাথা রেখে ফোঁপাচ্ছে। পাশ ফিরে চোখের জল মুছে আমিও তখন দূরে চলে যাওয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়ে।
পাশের বাড়ির আনন্দ আমার বাড়িতে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে পড়ে, আমার বাড়ির দুঃখ পাশের বাড়িতে নিস্তব্ধতা এনে দেয়। সেবার মা যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো পাশের বাড়ির ওরা সারা রাত হাসপাতালে জেগে আর যখন ডাক্তারবাবু রক্ত চাই-এর নিদান দিল তখন পাশের বাড়িটাই ব্লাড ব‍্যাঙ্ক। বিল্টুর দাদা মাধ‍্যমিকে ফারস্ট ডিভিশনের খবর পেয়ে আমাদের বাড়িতে রসগোল্লা খেয়ে তারপর নিজের বাড়িতে ঢুকেছিল। পাশের বাড়িটাই নিজের বাড়ি, নিজের বাড়িটাই পাশের বাড়ি !
এখন আমাদের বাড়িতে আর পাশের বাড়ির ভাবনাগুলো ঢুঁ মারেনা। আমাদের বাড়ির খবর যেন ঘুনাক্ষরেও পাশের বাড়ির লোকজন টের না পায় তারজন‍্য নিজের বাড়িতেও সবস‍ময় ফিসফিস। আমার আনন্দ আমার একার ! আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমি তোমায় দেখতে নারি এই ভাবনায় বিভোর হয়ে দিন কাটাই।
কিন্তু একদিন আমার বাড়িতেও রাত নামে! আমার প্রিয়জন রাস্তায় দুর্ঘটনায় কাতরাতে কাতরাতে পাশের লোকটির দিকে ইশারায় সাহায‍্য চায়। পাশ কাটিয়ে অগুন্তি লোক হনহন করে চলে যায়। কেউ আর ‘পাশেরবাড়ির লোক’ হয়ে পাশে দাঁড়ায় না। মনে মনে অভিসম্পাত দিই তাদের‌। অথচ একবারও মনে পড়েনা যে আমার পাশের বাড়ির দিকে আমিও তো বহুদিন ফিরে দেখিনি। রাস্তার পাশের লোকগুলো হঠাৎ পাশের বাড়ি হয়ে পাশে দাঁড়াতে যাবে কেন !!!!!!!
পাশের বাড়ির দরজায় টোকা দিলাম—- কেএএএ—– আমি পাশের বাড়ির সুমন।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *